ভিতরে

দারিদ্র্য বিমোচনে নারীর অংশ গ্রহণ

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার চড়আঙ্গারু গ্রামের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিনী আলেয়া। একদিন সমাজকর্মী আসমা বেগমের সাথে পরিচয় হয় আলেয়ার। তাকে সংসারের সকল কষ্ঠের কথা খুলে বলে আলেয়া। তারপর সেই সমাজকর্মীর পরামর্শে প্রথমে স্বল্পসুদে সাত হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনটি ছাগল কেনে এবং সেগুলো লালন পালন শুরু করে। এক বছরের মধ্যে ছাগল তিনটি নয়টি বাচ্চা দেয়। বাচ্চাগুলো কিছুদিন পর বিক্রি করে আলেয়া ঋণের টাকা পরিশোধ করে। আবারো সে একই প্রতিষ্ঠান থেকে আরো ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে গাভী কেনে। অল্প কিছুদিন পর গাভীটি বাচ্চা দেয়। আলেয়া গাভির দুধ বিক্রি করে। এভাবেই তার সংসারের উন্নতি হতে থাকে। এরই মধ্যে আলেয়া তার স্বামীকে একটি ভ্যান রিক্সাও কিনে দেয়।
আলেয়া এখন সব ঋণের টাকা শোধ করে তিনটি গাভী ও তেরটি ছাগলের মালিক। আলেয়ার স্বামী প্রতিদিন সকালে ভ্যানে করে গাভীর দুধ বাঘাবাড়ি মিল্কভিটায় পৌঁছে দিয়ে নিজের কাজে চলে যায়। স্বামীর উপার্জনের পাশাপাশি আলেয়ার উপার্জনের ফলে তাদের সংসারে আর অভাব নেই। আলেয়ার সন্তানরা এখন স্কুলে যায়।
দেশে সম্পদের সীমবদ্ধতার কারণে দারিদ্র্য মোকাবলা করা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার পাঁচটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং একটি দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। এসব পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যই ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচন। এ যাবৎ বাস্তবায়িত উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে দেশে দারিদ্র্য অনেকট হ্রাস পেয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশের সাফল্য সকল মহলে সমাদৃত হয়েছে।
আমাদের দেশের নারীদের এক বিশাল অংশ আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত। বিশেষ করে কৃষিপণ্য উৎপাদন, মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগী পালন, সবজি বাগান, মৃৎশিল্প, বসতবাড়ির আশেপাশে বৃক্ষরোপন এবং বাঁশ ও বেতভিত্তিক শিল্পপণ্য ইত্যাদি কর্মের সাথে নারীরা সরাসরি জড়িত। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে কর্মরত শ্রমিকের প্রায় ৩৪ শতাংশই নারী। শহর কেন্দ্রিক শ্রমনির্ভর শিল্পে বিশেষত পোশাক শিল্পের আশি শতাংশ কাজ তারাই করে। কাপড় সেলাই, নকশা, বাটিক, বুটিক ও এমব্রয়ডারী ইত্যাদি উপার্জনমূলক কর্মের সাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী জড়িত। এছাড়াও নারীরা যুক্ত আছে বিপনীকেন্দ্র, অভ্যর্থনা ডেক্সে, বিজ্ঞাপনী সংস্থায়, শিক্ষকতা, শিল্পকলা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী মহলের বিভিন্ন স্তরে। কাজেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণ এখন ব্যাপক।
দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসরত ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক অবস্থান থেকে ছিটকে পড়া নারীকে উৎপাদনশীল কাজে এবং অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নারীরা যাতে অর্থনৈতিক সুযোগ লাভের পূর্ণ অধিকার পায় এবং তাদের গুণাবলী ও দক্ষতার স্বীকৃতি পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি ও সম্পদে সমান প্রবেশাধিকারকে উৎসাহিত করতে হবে। সকল শ্রেণীর, বিশেষ করে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসরত নারীদের মৌলিক, সামাজিক, শিক্ষাগত এবং চিকিৎসা সেবা পূরণের জন্য সরকারি ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। আর্থিক ও ঋণ সহায়তার সুযোগ যাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সুবিধাবঞ্চিত নারী উদ্যোক্তারা পায় সে দিকেও গুরত্ব দিতে হবে।
দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও রোগ প্রতিরোধ এবং প্রকৃত অর্থে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনে লিঙ্গ বৈষম্য রোধ, নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের বিকল্প নেই। কারণ মৌলিক ও মানবিক চাহিদাগুলো পূরণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের নারীরা এখনো পিছিয়ে আছে। সাংবিধানিকভাবে নারীর অধিকার ও নারী উন্নয়নের কথা বলা হলেও নানা প্রতিকুলতা এবং পুরুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে বড় বাধা। তাই বাংলাদেশের নারীদের প্রাপ্য অধিকার অর্জনে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।
দারিদ্র্য মোকাবেলায় নারী শিক্ষার বিকল্প নেই। কারণ শিক্ষার সাথে জাতীয় উন্নয়নের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটা আজ সুস্পষ্ট যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তরান্বিত করার ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার ভূমিকা অনেক। একজন শিক্ষিত নারী শ্রমিক আর একজন অশিক্ষিত নারী শ্রমিকের মধ্যে পারিশ্রমিকের অনেক পার্থক্য রয়েছে। তাই বেশি অর্থ উপার্জনে নারীদের শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষা সামাজিক কল্যাণ বয়ে আনে। একজন নারীকে লেখাপড়া শেখানোর অর্থই হচ্ছে তার পুরো পরিবারকে শিক্ষিত করা। একজন নারীকে শিক্ষিত করার অর্থ হচ্ছে পরিবার ও সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করা। নারীকে শিক্ষিত করার অর্থ তাকে স্বাবলম্বী করে তোলা। তাই দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর সম্মিলিত অংশগ্রহণ দরকার।
দেশ ও সমাজের উন্নয়নে আলেয়ার মতো ইচ্ছা ও ঐকান্তিক আগ্রহের ধারা যদি সব নারীর মধ্যে অব্যাহত থাকে তাহলে তারা পিছিয়ে থাকবে না। মনে রাখতে হবে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দারিদ্র্য মোকাবেলা সম্ভব নয়। সরকারের গৃহীত উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে নারীরা যাতে যুক্ত হতে পারে সে সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। নারীদের উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। সেই সাথে নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে পুরুষদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই নারী সমাজ উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে পুরুষের পাশাপাশি দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

আপনি কি মনে করেন?

0 টি পয়েন্ট
উপনোট ডাউনভোট
উত্তর দিন

মন্তব্য করুন

কর্মপরিকল্পনা সুনির্দিষ্ট হলে বাস্তবায়ন সঠিক হবে : চবি ভিসি

বাংলাদেশ-কোরিয়া বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ে ওয়েবিনার