ভিতরে

নারীকে অর্থনৈতিক মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে

আজকের মেয়ে শিশু আগামীকালের নারী। সমতা, উন্নয়ন ও শান্তির লক্ষ্যসমুহ পরিপূর্ণভাবে অর্জনের জন্য মেয়ে শিশুর দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও শক্তির বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ। মেয়ে সন্তান যেন তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে। তাকে সক্ষম করে গড়ে তোলার সহায়ক পরিবেশে প্রতিপালিত হতে হবে, যেখানে তার টিকে থাকা, নিরাপত্তা ও উন্নতির জন্য আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বস্তুগত চাহিদা পূরণ এবং তার সমান অধিকার দিতে হবে।
উন্নয়নের প্রত্যেক ক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের সমান অংশিদার করতে হলে এখন থেকেই মেয়ে শিশুকে মানুষের মর্যাদা ও মূল্য দিতে হবে। তার মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাগুলো পরিপূর্ণভাবে ভোগ করার সুযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে থাকবে সেইসব অধিকার, যার নিশ্চয়তা দেখা হয়েছে শিশু অধিকার বিষয়ক কনভেনশনে। এর সর্বজনীন অনুমোদন একান্ত জরুরী। অথচ দেখা যায় বিশ্বব্যাপি মেয়েদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও হিংস্রতা জীবনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু হয় এবং তা অব্যাহতভাবে চলতে থাকে সারাজীবন। পুষ্টি, শারিরিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের কম থাকে। ছেলেদের তুলনায় তারা শৈশব ও কৈশোরের অধিকার, সুযোগ ও সুফল ভোগ করতে তেমন পারে না। তারা প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের যৌন ও অর্থনৈতিক হয়রানির শিকার হয়।
দারিদ্র্যে বসবাসরত ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে ছিটকে পড়া নারীকে উৎপাদনশীল কাজে এবং অর্থনৈতিক মুলধারায় সম্পৃক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণভাবে স্থানান্তরিত নারী যাতে অর্থনৈতিক সুযোগ লাভের পূর্ণ অধিকার পায় এবং অভিবাসী ও শরণার্থী নারীদের গুনাবলী ও দক্ষতা যাতে স্বীকৃত পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীল সম্পদে সমান প্রবেশাধিকার উৎসাহিত করতে হবে। সকল শ্রেণীর বিশেষ করে দারিদ্র্যে বসবাসরত নারীদের মৌলিক সামাজিক, শিক্ষাগত এবং স্বাস্থ্য চাহিদা পুরণের জন্য সরকারি ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। আর্থিক ও ঋণ সহায়তার সুযোগ যাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠির সুবিধাবঞ্চিত নারী উদ্যোক্তারা পায় সে বিষয়েও নিশ্চয়তা দিতে হবে।
দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ প্রতিরোধ এবং প্রকৃত অর্থে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনে সর্বোপরি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য জেন্ডার সমতা বিধান ও নারীর ক্ষমতায়নে অঙ্গিকারাবদ্ধ। এজন্য তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়। এগুলো হচ্ছে : জেন্ডার সমতা বিধান বিষয়ক শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক শিক্ষা। এই তিনটি ক্ষেত্রে যে উপাত্ত সংগৃহীত হয়েছে তাতে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জেন্ডার বৈষম্য বিদ্যমান। এ অবস্থায় ক্রমাগত উন্নতি পরিলক্ষিত হলেও এখন পর্যন্ত এক চতুর্থাংশ দেশে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে জেন্ডার বৈষম্য রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ার ১৮টি দেশে ছেলে ও মেয়ের স্কুলে ভর্তির অনুপাত হচ্ছে ১০০ ঃ ৮০ অথবা তার নিচে। এশিয়া ও উপসাগরীয় আফ্রিকায় এক চতুর্থাংশেরও কম মহিলা অকৃষিকার্যে নিযুক্ত আছে। মধ্যপ্রাচ্যে এ সংখ্যা এক চতুর্থাংশের নিচে। এসকল দেশে জাতীয় সংসদে নারীর আসন মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ। জেন্ডার সমতা বিধান ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হলেও নব্বই দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় অকৃষিখাতে মহিলাদের কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে।
আইন ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন আনার মধ্যে দিয়ে লিঙ্গ সমতা করার জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নারীর সুযোগ ও বেছে নেয়ার সামর্থ এখনো সীমিত পর্যায়ে আছে। লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে আরো নানা চ্যালেঞ্জ নারীকে মোকাবেলা করতে হয় প্রতিনিয়ত। নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বিলোপ সনদের (সিডো) মুল লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য বিলোপ নিশ্চিত করা।
সম্প্রতি ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের অংশগ্রহণে অনলাইন ভিত্তিক একটি জরিপ করা হয়। এতে ৭২৭ জন উত্তরদাতা অংশগ্রহণ করে। পুরো জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে উত্তরদাতাদের মধ্যে সিডো সনদ এবং বাংলাদেশে বিদ্যমান প্রাসঙ্গিক আইন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা বা পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তবে খুব ছোট একটি অংশ ছাড়া প্রায় সবাই মনে করে, নারীরা নানা ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার এবং এ বৈষম্য বিলোপ হওয়া প্রয়োজন। তবে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র উপহার দেয়ার জন্য সঠিত তথ্য প্রচারের মাধ্যমে জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও অন্যতম চ্যালেঞ্জ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানে ১০, ১৯, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদে নারীর অধিকার সুরক্ষা অর্থাৎ নারীর ক্ষমতায়নের সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ প্রণীত নারীর প্রতি সকল বৈষম্য দুরীকরণ সনদ (সিডো) তে অনুস্বাক্ষরকারী একটি দেশ।
উন্নয়নের জন্য নারীর ক্ষমতায়নের চেয়ে অধিকতর কার্যকর কোন হাতিয়ার নেই। অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে এর মতো কার্যকরী নীতি নেই। স্বাস্থ্য উন্নয়ন সুনিশ্চিত এবং এইডস প্রতিরোধেও নারীর ক্ষমতায়নের কোন বিকল্প নেই। শিশুর শিক্ষার সম্ভাবনা এবং তাদের বিকশিত করার জন্যেও নারীর ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। অথচ উন্নয়নশীল দেশ সমুহে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অর্থ বিনিয়োগ করা হয় না।
একটি দেশের অর্ধেক নারী সমাজকে পশ্চাৎপদ রেখে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ও সমাজের স্বার্থেই নারী সমাজকে উন্নয়নের মুল স্রোতধারায় আনা প্রয়োজন। দেশে সকল ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সর্বোচ্চ পেশাদারির সঙ্গে কাজ করতে পারেন। সে কারণে বিভিন্ন পেশায় প্রচুর পরিমাণে নারীরা যুক্ত হলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যাবে।

আপনি কি মনে করেন?

0 টি পয়েন্ট
উপনোট ডাউনভোট
উত্তর দিন

মন্তব্য করুন

ডিজিটাল বাংলাদেশে নারীদের সঙ্গী ‘তথ্য আপা’

সম্পূর্ণ অন্যায় পরিস্থিতিতে নাভালনি : বাইডেন